প্রশ্ন ফাঁসের দায় সরকারের ওপর বর্তায়: আবুল কাসেম ফজলুল হক

নোয়াখালী বার্তা | ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ | ০৭:২৪ পূর্বাহ্ণ |আপডেট: ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ | ০৭:২৯

নোয়াখালী বার্তা ডেস্ক: শিক্ষামন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী অনেক বেফাঁস কথা বলেছেন যা দুঃখজনক এবং দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়। সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. আবুল কাসেম ফজলুল হক।

তিনি বলেন, দুর্নীতির ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা চলছে। শুধু শিক্ষামন্ত্রণালয় নয় অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানেও দুর্নীতির একই অবস্থা বিরাজ করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। বিশিষ্ট এই শিক্ষাবিদ বলেন, বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের দায় সরকারের ওপর বর্তায়।

পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ, উপস্থাপনা এবং তৈরি করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মোতালেব ও মন্ত্রণালয়ের অপর এক কর্মচারী নাসিরকে গ্রেপ্তার করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তাকে এভাবে আটকের ঘটনা দুর্নীতি দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে অনেকেই আশা করছেন। আপনি বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন?

শিক্ষামন্ত্রণালয়ে যে ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে এবং যে দুর্নীতির চিত্র সামনে এসেছে এ ধরনের দুর্নীতির চিত্র খোঁজ করলে অন্যান্য মন্ত্রণালয়েও পাওয়া যাবে বলে আমি মনে করি। এখানে যেহেতু শিক্ষামন্ত্রণালয়ের কথা এসেছে তাই বলব মন্ত্রী যদি অত্যন্ত সতর্ক থাকেন তাহলে এ দুর্নীতি হতে পারে না। শিক্ষামন্ত্রী দুর্নীতি নিয়ে অনেক বেফাঁস কথা বলেছেন। এসব কথা খুবই দুঃখজনক এবং দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়। এসব কথায় দুর্নীতি বাড়ে এবং দুর্নীতির ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা চলছে। আর যারা দুর্নীতি করে ধরা পড়েছে-সেটা বলা চলে ঘটনাক্রমে। হয়তো গোয়েন্দা বাহিনী বা দুর্নীতি দমন কমিশন এই একটি দুর্নীতি ধরেছে।

তবে যারা ঘুষ নেয় বা দুর্নীতি করে তারা যতই এটাকে গোপন রাখার চেষ্টা করুক না কেন লুকিয়ে রাখা যায় না। কোনো না কোনোভাবে সেটা ফাঁস হয়ে যায়। প্রত্যেকের প্রতিপক্ষ থাকে তারা ধরিয়ে দেয়। হয়তো এরকম কোনো ঘটনায় দুজন ধরা পড়েছে। তবে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের ২ জন দুর্নীতির দায়ে ধরা পড়ার ফলে যে এই অবস্থার উন্নতি হবে বলে আশা করা যায় না।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই কর্মচারীকে আটকের পর গণমাধ্যমে এসেছে, তাঁদের সম্পদের পরিমাণ ‘পাহাড়সমান’ এবং তারা দীর্ঘ দিন ধরে এ ধরনের দুর্নীতি করে আসছেন। কিছু দিন আগে শিক্ষামন্ত্রী সহনীয় পর্যায়ে ঘুষ নেয়ার কথা বলেছিলেন। এ অবস্থায় এই দুই কর্মচারীর দুর্নীতির দায় মন্ত্রী এড়াতে পারেন কি না?

না, ওইসব ঘটনার দায় মন্ত্রী এড়াতে পারেন না। এসব ঘটনায় মন্ত্রী এবং ওই মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ উচ্চপদে যারা আছেন তাদের বিষয়ে গভীরভাবে এবং নৈতিক দিক দিয়ে বিচার করলে তাদেরও দায়িত্বহীনতা ও যোগ্যতাহীনতার বিষয়টি ফুটে ওঠে। আর তাই তারাও এর দায় এড়াতে পারেন না।

আটক দুজনের বিরুদ্ধে নানাবিধ অভিযোগের মধ্যে রয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁস, জিপিএ-৫ বিক্রির বিষয়টি। আমরা দেখেছি শিক্ষামন্ত্রী প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থানের কথা বলেছেন অথচ তারই পিও’র বিরুদ্ধে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ.. বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন।

দেখুন, এসব অপরাধমূলক কাজ বা দুর্নীতি যে সম্পূর্ণভাবে মন্ত্রীর অজ্ঞাতে হচ্ছে সেকথা বলা যায় না। তার কাছের লোকের দ্বারা এই প্রশ্নপত্র ফাঁস, জিপিএ-৫ বিক্রি, বিভিন্ন অনুমোদন করিয়ে দেয়াসহ নানা দুর্নীতিমূলক কাজ হচ্ছে । ফলে বলা যায় এতে মন্ত্রীর যোগ্যতা এবং দায়িত্ববোধের অভাব রয়েছে।

তবে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, পঞ্চম শ্রেণি, অষ্টম শ্রেণি এবং দশম শ্রেণির পরীক্ষা যেসব বোর্ড নিয়ে থাকেন তাদের কোনো স্বাধীনতা এবং স্বায়ত্বশাসন রক্ষা করা হয় না। সবটাই নিয়ে নিয়েছেন-সরকার, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়। আর প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ নানা ধরেণের অনিয়মের অভিযোগ শিক্ষামন্ত্রণালয় এবং সরকারের বিরুদ্ধেই যায়।

আমাদের জাতীয় শিক্ষানীতি আছে, রাষ্ট্রের সংবিধান আছে। দেশের সেই সংবিধানের আওতায় তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার কথা। অন্য কোনোরকম হস্তক্ষেপ তাদের ওপর থাকবে না। এরকম পরিবেশে থাকলে প্রত্যেকটি শিক্ষাবোর্ড আরো বেশি দায়িত্বশীল হতো কিন্তু আমাদের শিক্ষানীতি অত্যন্ত ক্রুটিপূর্ণ। পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষা রাখার তো কোনো দরকার নেই। প্রথম শ্রেণি, দ্বিতীয় শ্রেণি এবং তৃতীয় শ্রেণির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। এবারের এসএসপি পরীক্ষার প্রায় সব প্রশ্নই ফাঁস হয়েছে। এসব ঘটনার দায়িত্ব সরকারের ওপরই বর্তায়। শিক্ষানীতি এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ওপরই বর্তায়। এখানে যদি কিছু সংস্কার করা হয় তাহলে অবস্থা উন্নতির দিকে যাবে। সৃজনশীল পরীক্ষার যে পদ্ধতি বর্তমানে রয়েছে তা পরিবর্তন করে জ্ঞানমুখী এবং শিক্ষামুখী পরীক্ষা পদ্ধতি করা দরকার।

শিক্ষামন্ত্রণালয়ের দুজন কর্মচারী ধরা পড়লেন দুর্নীতির অভিযোগে। অভিযোগ রয়েছে অন্য মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। আপনার পর্যবেক্ষণ কি বলে?

আমার ধারনাও তাই। অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। আমাদের মিডিয়া, পত্রপত্রিকা ও ফেসবুকেও এসব বক্তব্য ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে। একটা সময় ছিলো যখন এদেশের মানুষ দুর্নীতি চাইত না। মানুষ তখন দুর্নীতির প্রতি অসহিষ্ণু ছিল। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তখন মানুষ আন্দোলন করত। এখন আর মানুষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলন কোনোটাই করে না। দুর্নীতিকে মেনে নিয়েই আমাদের চলতে হবে এমন মনোভাব তৈরি করা হয়েছে মানুষের মধ্যে। আর এতে দুর্নীতি আরো বাড়ছে। তবে ভালো অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য অবশ্যই দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলন করতেই হবে। এভাবে কী চলতে পারে!

বাংলাদেশে ঘুষ-দুর্নীতি বেড়ে যাওয়ার কারণ কী বলে আপনি মনে করেন? একইসঙ্গে জানতে চাই, ঘুষ-দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধে কী করা দরকার?

দেখুন ঘুষ-দুর্নীতিকে নির্দিষ্ট একটি সমস্যা ধরে কাজ করে এর সমাধান করা যাবে না। গোটা শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষানীতির সংস্কার দরকার। শিক্ষানীতি ২০১০ যেভাবে করা হয়েছে ওই শিক্ষানীতি দিয়ে জাতীয় শিক্ষার উন্নতি হবে না। ওই শিক্ষানীতিতে এমন অনেক কথা লেখা নেই অথচ তা শিক্ষামন্ত্রণালয় তার অন্তর্ভুক্ত সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। আমার মতে পঞ্চম এবং অষ্ঠম শ্রেণির পরীক্ষা বিলুপ্ত করা উচিত। অন্য পরীক্ষাগুলো ভালোভাবেই নেয়ার ব্যবস্থা করা উচিত। সৃজনশীল পরীক্ষার প্রশ্ন পদ্ধতি পরিবর্তন করে জ্ঞানমুখী ও শিক্ষামুখী প্রশ্ননীতি প্রবর্তন করা দরকার। পাঠ্যপুস্তক ও সিলেবাস কারিক্যুলাম উন্নত করলে দুর্নীতির প্রবণতা অনেক কমে যাবে। যার ওপর জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রম নির্ভর করে সেটাকে খুব বেশি ক্রুটিপূর্ণ করা হয়েছে। কখনও কখনও এমনও মনে হয়েছে সরকার কী সুশিক্ষা চায়? কুশিক্ষা- অপশিক্ষা এসব নানাভাবে মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।

সমাধান কোন পথে?

সমাধান কোন্‌ পথে সে বিষয়ে আমি একটু পিছিয়ে গিয়ে বলব, সিলেবাস কারিক্যুলাম এবং পাঠ্যপুস্তক উন্নত করতে হবে। টেস্কটবুক বোর্ডকে সবরকমের বৈদেশিক চাপ এবং প্রলোভনমুক্ত রাখতে হবে। যারা এইসব কাজ করেন তারা বিদেশি টাকা পেলেই মন বদলে ফেলে। এটাও ঘুষ খাওয়ার মতো খারাপ এবং অনৈতিক ব্যাপার। তারপর শিক্ষা প্রশাসনে রয়েছে সীমাহীন দুর্নীতি। শিক্ষক নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে এসব দুর্নীতি হয়ে থাকে। এমনকি পাবলিক সার্ভিস কমিশনও বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত। সেখানে আসলেই দুর্নীতি হচ্ছে। সরকারের মন্ত্রী এইচ টি ইমাম সরকারি ছাত্র সংগঠনের একটি সভায় বলেছেন, তোমরা কোনোমতে লিখিত পরীক্ষায় পাস করে আসো মৌখিক পরীক্ষা আমি দেখব! আর মৌখিক পরীক্ষা আমি দেখব মানে হচ্ছে পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেবেন তাদেরকে-এটিই তো বোঝায়। মৌখিক পরীক্ষার নাম্বার হচ্ছে ২০০। এই ২০০ নম্বর রাখা হয়েছে তো দুর্নীতি করার জন্য। এরকম অনেক বিষয় রয়েছে। ফলে শিক্ষানীতিকে সংস্কার করে উন্নত করলে সমস্যার সমাধান সম্ভব হতে পারে। তবে একবারেই সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। পর্যায়ক্রমে ধাপে ধাপে এ সংকটের সমাধান হবে বলে মনে করি। আর সবশেষে আমি আবারও বলব প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ শিক্ষা ক্ষেত্রে দুর্নীতি মুক্ত করতে হলে সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে দুর্নীতিকে এবং প্রতিকারের জন্য আইনগত ব্যবস্থার বাইরেও কিছু সংস্কার করা প্রয়োজন।

Please follow and like us:
error0

এরকম আরো সংবাদ