Select Page

আজ বুধবার, ৩০শে নভেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৫ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি সময়: দুপুর ১:৪১

সামাজিক যোগাযোগের নেশা

নোয়াখালী বার্তা ডেস্ক

নভে ৬, ২০১৭ | মতামত

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার বাংলাদেশের মানুষের কাছে, বিশেষত তরুণদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে দিন দিন। এ যেন তাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে আমাদের মোবাইল ফোনটি আমাদের জানান দেয় আমাদের সমাজে কি কি ঘটে গেল। ফোন করে কথা বলার পরিবর্তে এই যন্ত্রটি রূপান্তরিত হয়েছে নানান জায়গায় ঘটে যাওয়া আমাদের বন্ধুদের খবর দেয়ার যন্ত্রে।

শুধুমাত্র সংবাদপ্রাপ্তি নয়, এই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো পরিণত হয়েছে আমাদের প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবেও। সামাজিক অন্যায়, অত্যাচারসহ ভাললাগা, মন্দলাগার সব অনুভূতিই এখন প্রকাশ পায় এই মাধ্যমে।

তবে এসবের মাঝেই কিছু প্রশ্ন রয়ে যায়। আমরা কি আসক্ত হয়ে পড়ছি এসকল যন্ত্রের মধ্যে? এগুলো কি আমাদের ওপর নেতিবাচক কোনও প্রভাব ফেলছে?

ইউনিভার্সিটি অফ লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের একদল তরুণ নির্মাতা এসকল প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেরিয়েছে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের কাছে। জানতে চেয়েছে তাদের মতামত। সেই গবেষণার উপর ভিত্তি করেই আলিফ ইসলাম মুকুটের পরিচালনায় নির্মিত হয়েছে প্রামাণ্যচিত্র ‘ডোপামিন’, যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় নেশা।

প্রামাণ্যচিত্রটিতে উঠে এসেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নানাবিধ ব্যবহার এবং তার প্রভাব। বর্তমান সময়ে একদিকে যেমন বাকস্বাধীনতার কথা বলা হচ্ছে, অপরদিকে বেড়েই চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের সংখ্যা। আমাদের সমাজে অনেকেই, বিশেষত মেয়েরা এখনও বাস্তব পৃথিবীর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতেও নিরাপদ নয়। গবেষণায় অংশ নেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা মনে করেন, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের মত জায়গায় তথ্য নিরাপদ নয় সেখানে জনগণের যে তথ্য সামাজিক মাধ্যমগুলোতে আছে তার নিরাপত্তা কোথায়?

মানবাধিকার আইনজীবীদের মতে, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহারের ফলে বর্তমানে অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করাও আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে গেছে। যার প্রেক্ষাপটে পারিবারিক মামলার সংখ্যাও দিন দিন বেড়েই চলছে। আইনজীবী মাহাথির মোহাম্মাদ রাতুল বলেন, ‘ইন্টারনেট যারা হেনস্থার শিকার হচ্ছে তাদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যাই বেশি। মেয়েদেরকে যদি এইসকল বিষয়ে সচেতন করা যায় এবং একইসঙ্গে যদি আইনের প্রয়োগ বৃদ্ধি পায় তবেই এর ক্ষতিকর প্রভাব অনেকাংশেই কমানো সম্ভব’।

জরিপের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আমাদের দেশে যারা এই সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন তাদের মধ্যে প্রায় ৩৬ শতাংশ মানুষ এতে নানারকম অপরাধমূলক কার্যক্রমের সাথে জড়িত। তরুণরা কেন নিজেদেরকে এমন কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত করছে এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টারের যোগাযোগ বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষজ্ঞ সুমাইয়া তাবাসসুম আহমেদ বলেন, ‘আমাদের তরুণরা অনলাইনে ভাল মন্দ যাই করুক তারা খুব দ্রুত মানুষের নজর কাড়তে পারে। এটা তাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সকল ব্যবহার যদি নজরদারিতে নিয়ে আসা যায় তাহলে তারা প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভাল ও ইতিবাচক কিছু করতে উৎসাহিত হবে।’

অপরদিকে মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ এবং নেতৃত্ব প্রশিক্ষক খালেদ সাইফুল্লাহ মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেগুলোতে তরুণদের যে ভূমিকা তার জন্য তারা তাদের বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হচ্ছে। অধিকাংশ সময়েই বাবা মা এখানে ভূমিকা পালন করতে পারে না। তাই তরুণদের আদর্শগত শিক্ষা প্রদান জরুরি।

জরিপে মতামত প্রদান করা তরুণদের মতে, বাংলাদেশে তরুণদের সঠিক অবস্থানে এবং সঠিক কাজে নিযুক্ত করা যাচ্ছে না, যে কারণেই তারা অনেক সময় নিজেদেরকে ব্যস্ত রাখার জন্য এসকল কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। নিজেদেরকে ব্যস্ত রাখতে তরুণরা দিনে প্রায় ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত এসকল মাধ্যমে সময় কাটাচ্ছে।

দেশের সচেতন তরুণরা মনে করে, এটা অনেকটাই আসক্তির মত। একবার এতে জড়িয়ে পড়লে এখানে সময় দিতেই হবে। বের হওয়ার পথ খুবই কঠিন।

সামাজিক মাধ্যমের অধিক ব্যবহারের ফলে তরুণদের মধ্যে হতাশা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সকল মাধ্যমে তরুণরা যেভাবে অন্য মানুষের সাথে সম্পৃক্ত বাস্তব জীবনটা ঠিক তার উল্টো। এক পাশে সবাই যেমন তাকে কিছু করার জন্য, বলার জন্য উৎসাহ দেয় অপর পাশে হয়ত কেউ তাকে চিনেই না। এ দুটি পৃথিবীর তুলনা করতে গেলেই তারা মূলত হতাশ হয়ে যায়।

জরিপে অংশ নেয়া ব্যবহারকারীদের মতে, শতকরা ৪৮ ভাগ মানুষের জীবনে এ সকল মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অপরদিকে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ এসকল মাধ্যমে নানা রকম হয়রানির শিকার হয়েছে। যা কিনা আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তরুণদের মতে এই সকল মাধ্যমের উপর অত্যধিক হারে বেড়ে যাওয়া নির্ভরশীলতা বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য সুখকর নয়। যে তরুণরা বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত তাদেরকে অবশ্যই নতুন কিছু ভাবতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুদ্ধ না করে বাংলাদেশের ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য মাঠে নামতে হবে। অংশগ্রহণ করতে হবে অন্যান্য সামাজিক কর্মকাণ্ডে। তবেই বাংলাদেশ তরুণদের নেতৃত্বে সুন্দরের পথে এগিয়ে যাবে।

প্রামাণ্যচিত্রটি ইতোমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্ম সোসাইটি আয়োজিত ‘আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচিত্র প্রতিযোগিতা ২০১৭’তে প্রায় ১৭০০ চলচিত্রের মাঝে বাছাইকৃত হয়ে প্রদর্শনীর জন্য নির্বাচিত হয়েছিল।

মুতাসিম বিল্লাহ

Facebook Comments Box

সর্বশেষ সংবাদ

Archive Calendar

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০